মো. রফিকুল ইসলামঃ
লেখার শুরুতেই পাঠকের জানা আবশ্যক পম্পেই কী। পম্পেই হলো ইতালির কাম্পানিয়া অঞ্চলে নেপলসের কাছে অবস্থিত একটি প্রাচীন শহর নাম রোমান। খ্রিষ্টীয় ৭৯ সালের ২৪ আগস্ট মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতে এই সমৃদ্ধশালী শহরটি লাভা ও ছাইয়ের নিচে সম্পূর্ণ চাপা পড়ে। যুগ যুগ ধরে বরফে বা সময়ের ফ্রেমে আটকে থাকা এই ধ্বংসাবশেষ আধুনিক যুগে প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে প্রাচীন রোমান জীবনযাত্রার এক অমূল্য দলিল। পম্পেইয়ের ইতিহাস ও ধ্বংসলীলা অবস্থান: এটি ইতালির নেপলস উপসাগরের কাছে ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির পাদদেশে গড়ে উঠেছিল।

উৎপত্তি: খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ বা ৭ম শতাব্দীতে শহরটির গোড়াপত্তন হয় এবং পরবর্তীতে এটি রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। অগ্নিনপাত: ৭৯ খ্রিষ্টাব্দের অগ্ন্যুৎপাতে কয়েক মিটার পুরু ছাই এবং পাথরের স্তরের নিচে শহরটি হারিয়ে যায়, ফলে হাজারো মানুষ প্রাণ হারায়।
আবিষ্কার: দীর্ঘ ১৭ শতক পর ১৭৪৮ সালে প্রকৌশলীরা মাটি খুঁড়ে এই হারানো শহরের সন্ধান পান।
বর্তমান অবস্থা ও আকর্ষণ সংরক্ষণ: আগ্নেয়গিরির ছাইয়ের নিচে চাপা পড়ার কারণে এখানকার ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, কলার ও মানুষের অবয়ব নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত হয়েছিল।
ঐতিহ্য: এটি বর্তমানে একটি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র।শিল্পকর্ম: এখানকার প্রাচীন দেওয়ালচিত্র বা ফ্রেস্কো ও বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গবেষকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
এবার আসি মূল আলোচনায় রোমান সাম্রাজ্যের পম্পেই এবং বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও সময়কাল সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, মানুষের সামাজিক আচরণ এবং নৈতিক স্খলনের কিছু ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিচে পম্পেইয়ের সেই সময়ের নৈতিক অবক্ষয়ের সাথে বর্তমান বাংলাদেশের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরছি-

যৌনতা ও অনৈতিক ব্যবসা:-
পম্পেই: সেখানে বেশ্যা বৃত্তি বা পতিতালয় (লুপানার) ছিল সম্পূর্ণ বৈধ, উন্মুক্ত এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ব্যবসা। রাস্তায় বা দেওয়ালে প্রকাশ্য যৌন প্রতীক ও বিজ্ঞাপন আঁকা থাকত।
বাংলাদেশ: বাংলাদেশে পম্পেইয়ের মতো সামাজিকভাবে যৌনতার উন্মুক্ত প্রদর্শন বা প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা (কিছু নির্দিষ্ট আইনি পতিতালয় ছাড়া) নেই। তবে এখানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গোপন এসকর্ট সার্ভিস, অনলাইন পর্নোগ্রাফি এবং অনৈতিক ব্যবসার বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
মানবধিকার লঙ্ঘন ও আধুনিক দাসপ্রথা:–
পম্পেই: সমাজ ছিল দাসপ্রথার ওপর নির্ভরশীল। দাসদের কোনো অধিকার ছিল না; তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন ও জোরপূর্বক শ্রম খাটানো ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
বাংলাদেশ: আইনিভাবে দাসপ্রথা না থাকলেও বাংলাদেশে গৃহকর্মী নির্যাতন, জোরপূর্বক শিশুশ্রম, ইটভাটায় শ্রমিকদের বন্দি রেখে কাজ করানো এবং মধ্যপ্রাচ্যে মানবপাচারের মতো ঘটনাগুলো আধুনিক রূপের দাস প্রথারই প্রতিফলন।
নিষ্ঠুরতা ও সামাজিক অবক্ষয়:-
পম্পেই: গ্ল্যাডিয়েটরদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং মানুষ বা পশুর মৃত্যু দেখে হাজার হাজার মানুষ হাততালি দিয়ে আনন্দ উল্লাস করত।
বাংলাদেশ: বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা, প্রকাশ্যে কুপিয়ে মানুষ হত্যা এবং সেই নির্মম দৃশ্য প্রতিবাদের বদলে সাধারণ মানুষের মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ বা ভিড় জমানোর মানসিকতার মধ্যে পম্পেইয়ের সেই ‘সহিংসতা উপভোগের’ আধুনিক রূপ দেখা যায়।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্নীতি:-
পম্পেই: ধনী প্রার্থীরা নির্বাচনে জয়ী হতে নাগরিকদের বিনামূল্যে খাবার, মদ এবং গ্ল্যাডিয়েটর খেলার টিকিটের টোপ দিয়ে ভোট কিনত।
বাংলাদেশ: বাংলাদেশের রাজনীতিতেও কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব প্রবল। ভোট কেনাবেচা, ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডারবাজি, সিন্ডিকেট করে পণ্যের দাম বাড়ানো এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের মতো চরম নৈতিক স্খলন এখানে প্রতিনিয়ত ঘটছে।
চরম সামাজিক বৈষম্য:-
পম্পেই: এক শ্রেণির মানুষ যখন বাগান ও ফোয়ারা ঘেরা বিশাল প্রাসাদে বিলাসী জীবন কাটাত, অন্য বড় অংশটি তখন ভাঙা ও নোংরা ফ্ল্যাটে মানবেতর জীবনযাপন করত।
বাংলাদেশ: বর্তমান বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট। একদিকে গুলশান-বনানীর বিলাসবহুল জীবন ও দামী গাড়ির ছড়াছড়ি, অন্যদিকে বস্তিবাসী বা নিম্নবিত্ত মানুষের দুবেলা দুমুঠো ভাতের জন্য তীব্র সংগ্রাম পম্পেইয়ের সেই চরম বৈষম্যকেই মনে করিয়ে দেয়।
ইতিহাস কখনো মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। ইতিহাস থেকে শিখার অনেক কিছু আছে। পম্পেই ইতিহাস এবং আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এক ও অভিন্ন মনে হচ্ছে।তাই আমাদের সকল নাগরিকের সমস্বরে চিৎকার করে বলতে হবে আমরা পম্পেই নগরী হিসেবে বাংলাদেশ পরিনতি চাই না। আমার দেশ কে খোদার গজব থেকে রক্ষা করতে হলে আমাদের পাপের পথ দ্রুত বর্জন করতে হবে।
অসাধারন..