শেখ কামরুল হাসান সাহাঃ
গাজীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য, শিক্ষক ও শ্রমিকনেতা আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা আপিলের শুনানি আগামীকাল ১১ আগস্ট পর্যন্ত মুলতবি করেছেন আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী-এর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ ধারাবাহিক শুনানি শেষে পরবর্তী শুনানির জন্য এ দিন নির্ধারণ করেন।
প্রায় ২২ বছর ধরে চলমান দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক হত্যা মামলার আপিল শুনানি নতুন তারিখে গড়ানোয় গাজীপুরসহ সারা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবারও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হয়েছে। অন্যদিকে দণ্ডিত ও অভিযুক্তদের স্বজন এবং সমর্থকদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে, বিচারিক প্রক্রিয়ায় যদি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি অভিযুক্ত হয়ে থাকেন, তবে তারও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। ফলে মামলাটি ঘিরে দুই পক্ষের অবস্থান নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০০৪ সালের ৭ মে গাজীপুরের নোয়াগাঁও এম. এ. মজিদ মিয়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এক জনসভায় প্রকাশ্য দিবালোকে একদল আততায়ী নৃশংসভাবে হামলা চালিয়ে গুলি ছোড়তে থাকে এতে নিহত হন আহসান উল্লাহ মাস্টার এমপি। তিনি ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে গাজীপুর-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পাশাপাশি তিনি আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য এবং জাতীয় শ্রমিক লীগের কার্যনির্বাহী সভাপতি ছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডে সে সময় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ঘটনার পর দায়ের হওয়া মামলায় ২০০৫ সালের ১৬ এপ্রিল ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ২২ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৬ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। পরে ২০১৬ সালে হাইকোর্ট কয়েকজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন, কয়েকজনের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন এবং কয়েকজনকে খালাস দেন। পরবর্তীতে দণ্ডিত আসামিরা আপিল করেন এবং খালাসপ্রাপ্ত কয়েকজনের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষও আপিল করে। বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে এসব আপিলেরই শুনানি চলছে।
আদালতে আসামিপক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস. এম. শাহজাহান, হেলাল উদ্দিন মোল্লা, সৈয়দ মিজানুর রহমান ও শফিউল্লাহ শুনানিতে অংশ নেন। রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ আবদুল জব্বার ভূঁইয়া এবং ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ওবায়দুর রহমান।
নুরুল ইসলাম দিপুর দাবিঃ
মামলার অন্যতম দণ্ডিত আসামি এবং জাতীয় ছাত্র সমাজের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম দিপু অতীতে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ এবং একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষক তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রেরণা, আলোকবর্তিকা ও আদর্শ। তিনি বলেন, শিক্ষককে শ্রদ্ধা করা এবং তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করেই তার জীবন গড়ে উঠেছে। অথচ পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে শিক্ষক হত্যার মতো জঘন্য অভিযোগ এনে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন ধ্বংসের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।
দিপুর দাবি, মামলার তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার বিভিন্ন দিক নিয়ে তার প্রশ্ন রয়েছে। সব তথ্য-প্রমাণ নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা হলে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলেও তিনি মত দেন। তিনি আদালতের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ন্যায়বিচারের মাধ্যমেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
তবে উল্লেখ্য, এগুলো নুরুল ইসলাম দিপুর ব্যক্তিগত দাবি ও আত্মপক্ষ সমর্থনের বক্তব্য। মামলাটি বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন এবং তার দাবির বিষয়ে আদালতের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
নুরুল ইসলাম সরকারের প্রসঙ্গঃ
এদিকে টঙ্গীর স্থানীয় বিএনপি নেতা, যুবদলের কেন্দ্রীয় সাবেক শিল্প বিষয়ক সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম সরকার-ও এ মামলার একজন আসামি হিসেবে দীর্ঘদিন কারাবন্দি রয়েছেন। তার পরিবার ও দলীয় নেতা-কর্মীদের দাবি, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। তাকে মুক্তির দাবিতে বিভিন্ন সময় টঙ্গী ও আশপাশের এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ এবং মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
তবে এই দাবিগুলো সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য। মামলাটি বিচারাধীন থাকায় এসব বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায়ই হবে আইনগতভাবে নির্ধারক।
চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় গাজীপুরঃ
দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় মামলার কয়েকজন দণ্ডিত আসামি এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যক্ষদর্শীর মৃত্যু হয়েছে। ফলে মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহ আরও বেড়েছে।
আইনি বিশ্লেষকদের মতে, আগামী ১১ আগস্টের শুনানি মামলার পরবর্তী অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
গাজীপুরবাসীর প্রত্যাশা—আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত দোষীদের বিচার নিশ্চিত হোক এবং আদালতের বিচারে যদি কোনো নির্দোষ ব্যক্তি অভিযুক্ত হয়ে থাকেন, তবে তিনিও যেন ন্যায়বিচার লাভ করেন।
উল্লেখ্য, এ মামলাকে ঘিরে অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নেতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলো আদালতে প্রমাণিত নয়। বিচারাধীন এ মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে আদালতের রায়ের ওপর নির্ভরশীল।