নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে জনতার হাতে আটক অটোরিকশা ছিনতাইকারী, পুলিশে সোপর্দ। রহস্যজনক কারণে ৩৪ ধারায় আদালতে প্রেরণ। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে উঠছে একাধিক প্রশ্ন?
জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় অটোরিকশা ছিনতাই ও চালককে মারধরের অভিযোগে দায়ের করা অভিযোগকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় জনতার হাতে এক অভিযুক্ত ছিনতাইকারী আটক হওয়ার পর তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তাকে অটোরিকশা ছিনতাইয়ের মামলায় যুক্ত না করে নন এফআইয়ার প্রসিকিউশনে মামলা নং-১৫৬/২৬- এ পুলিশ আইনের ৩৪ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন শিমরাইলের তাজ জুট মিল মাঠ এলাকায়।
জানা গেছে, গত ২৮ আগস্ট রাতে বন্দর থানাধীন এলাকায় অটোরিকশা চালককে মারধর করে তার অটোরিকশা নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে বন্দর থানায় অভিযোগ করা হয়।
এর পরদিন ২৯ আগস্ট স্থানীয় লোকজন শিমরাইলের তাজ জুট মিল মাঠ এলাকায় সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে আটক করেন। তাকে ঘিরে সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। স্থানীয়দের দাবি, ঘটনাস্থলে প্রায় পাঁচ শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে সাবেক ইউপি সদস্য সেলিম, স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ এলাকার সাধারণ মানুষও ছিলেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা তিনজন সাংবাদিক মোবাইল ফোনে ওই ব্যক্তির বক্তব্য ভিডিও ধারণ করেন বলে জানা গেছে। সংরক্ষিত ওই ভিডিওতে আটক ব্যক্তি অটোরিকশা ছিনতাইয়ের ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা বলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি নূর আলমসহ আরও চারজনের নাম উল্লেখ করে তাদের সঙ্গে ঘটনার সম্পৃক্ততার কথাও বলেছেন—এমন দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পরে আইনগতভাবে
পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
স্থানীয়দের হাতে আটক ওই ব্যক্তিকে পরে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার এএসআই মিলনের কাছে সোপর্দ করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এখানেই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
কারণ, অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগে বন্দর থানায় অভিযোগ থাকা অবস্থায় আটক ব্যক্তিকে কেন সেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হলো না—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বন্দর থানায় মামলা গ্রহণে প্রায় ৭২ ঘণ্টা বিলম্ব হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত এএসআই আকবর ছুটিতে থাকায় মামলা গ্রহণে বিলম্ব হয়েছে।
অন্যদিকে, এই সময়ের মধ্যেই সিদ্ধিরগঞ্জ থানা থেকে আটক ব্যক্তিকে Non-FIR প্রসিকিউশন মামলা নং-১৫৬/২৬-এর মাধ্যমে পুলিশ আইনের ৩৪ ধারায় আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগ, তাহলে ৩৪ ধারায় কেন?
ঘটনার এখানেই শেষ নয়। প্রশ্ন উঠছে—যদি তদন্তে অটোরিকশা ছিনতাই, মারধর এবং একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার মতো প্রাথমিক তথ্য থাকে, তাহলে আটক ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট ছিনতাই মামলার তদন্তের আওতায় না এনে আলাদা Non-FIR মামলায় আদালতে পাঠানোর প্রয়োজন হলো কেন?
আরও প্রশ্ন হচ্ছে—
বন্দর থানায় অভিযোগ থাকার বিষয়টি কি সিদ্ধিরগঞ্জ থানাকে জানানো হয়েছিল?
জানানো হয়ে থাকলে, আটক ব্যক্তিকে বন্দর থানার মামলায় হস্তান্তর করা হলো না কেন?
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিও বক্তব্য কি তদন্তের অংশ হিসেবে সংগ্রহ করা হয়েছে?
আটক ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কথিত সহযোগীদের শনাক্ত বা গ্রেপ্তারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে কি না?
ছিনতাই হওয়া অটোরিকশাটি উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
এমন একাধিক প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারের মধ্যেও তৈরি হয়েছে।
৭২ ঘণ্টার বিলম্ব—কাকতালীয়, নাকি সমন্বয়হীনতা?
ঘটনার ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। একদিকে ২৮ আগস্ট অভিযোগ, পরদিন স্থানীয়দের হাতে একজন সন্দেহভাজন আটক এবং পুলিশের কাছে সোপর্দ; অন্যদিকে প্রায় ৭২ ঘণ্টা পর মামলা গ্রহণ এবং এর মধ্যে আটক ব্যক্তিকে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় আদালতে পাঠানো—পুরো ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে পুলিশের দুই থানার সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ভিডিও আছে, সাক্ষী আছে—তবুও তদন্ত কতদূর?
ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং আটক ব্যক্তির কথিত বক্তব্য—এসব যদি তদন্তকারীদের কাছে থাকে, তাহলে সেগুলো অটোরিকশা ছিনতাইয়ের অভিযোগ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে।
বিশেষ করে আটক ব্যক্তি যদি সত্যিই নূর আলমসহ আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে থাকেন, তাহলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ পরবর্তী সময়ে কী তদন্ত করেছে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
—সবকিছুই তদন্তের অংশ হওয়ার কথা।
পুলিশের বক্তব্য কী?
এ ঘটনায় বন্দর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে পুলিশের পক্ষ থেকে আটক ব্যক্তিকে কোন আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে পাঠানো হয়েছে, এবিষয়ে, আয়ু এ,এস,আই মিলন, কেন তাকে বন্দর থানার সঙ্গে কোন যোগাযোগ না করেই Non-FIR ১৫৬/২৬-এর ৩৪(৬)এ চালান দিয়ে দেয়। এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা, সাংবাদিকরা জানতে চাইলে, তিনি কোন কথা না বলে মোবাইল ফোন কলটি কেটে দেয়।
কারণ, একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি জনতার হাতে আটক হওয়ার পর পুলিশের কাছে সোপর্দ হয়েছেন—এরপর তার বিরুদ্ধে কোন ধারায় এবং কোন মামলায় ব্যবস্থা নেওয়া হলো, সেটি শুধু ভুক্তভোগী পরিবারের নয়; আইন প্রয়োগের স্বচ্ছতা ও আন্তঃথানা সমন্বয়ের প্রশ্নও।
এখন দেখার বিষয়, আদালতের Non-FIR ১৫৬/২৬-এর নথি, জামিনের কাগজপত্র এবং বন্দর থানার মামলার এজাহারে কী তথ্য রয়েছে। এসব নথি সামনে এলে পুরো ঘটনার আইনি প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হবে।