শেখ কামরুল হাসান সাহাঃ
গাজীপুরের টঙ্গীতে ছয় বছর বয়সী এক শিশু শিক্ষার্থীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মো. মোসলেম আহমদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত। একই সঙ্গে শিশুটির বাবাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চলছে—গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন খবর সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ (জিএমপি) কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার। যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রচার না করা এবং গুজব ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানো থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে গাজীপুর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক ওমর হায়দার শুনানি শেষে আসামির জামিন আবেদন নাকচ করেন।
মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, আসামিপক্ষ আদালতে জামিনের আবেদন করেন। এ সময় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী বাদীপক্ষে আইনজীবী নিয়োগের আবেদন করা হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।
শুনানির শুরুতে বিচারক ভুক্তভোগী শিশুর ২২ ধারায় রেকর্ড করা জবানবন্দি দেখতে চান। পরে শুনানি এক ঘণ্টার জন্য মুলতবি করা হয়। জবানবন্দি পর্যালোচনা শেষে পুনরায় শুনানি শুরু হলে উভয় পক্ষের বক্তব্য, শিশুর জবানবন্দি এবং মামলার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, আসামি জামিনে মুক্তি পেলে মামলার তদন্তকাজ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের গুরুতর অভিযোগে জামিনের বিষয়টি সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও তিনি আদালতকে জানান।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শরিফুল আলম বলেন, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল না এবং বর্তমান মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ নেই। অভিযোগগুলো মিথ্যা দাবি করে তিনি আসামির জামিন প্রার্থনা করেছিলেন। তবে শুনানি শেষে আদালত সেই আবেদন নাকচ করেন।
যেভাবে মামলার সূত্রপাত
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টঙ্গীর আউচপাড়ার শফিউদ্দিন রোডে অবস্থিত ক্বারীউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদরাসার ছয় বছর বয়সী এক ছাত্রীকে চুমু দেওয়া ও শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে গত ২১ অক্টোবর মামলা করা হয়। পরে মাদরাসার উপাধ্যক্ষ মো. মোসলেম আহমদকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠায় পুলিশ।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদরাসাটিতে হামলা, ভাঙচুর এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধরের অভিযোগও সামনে আসে। মাদরাসার অধ্যক্ষ ক্বারী মো. আলমাছ হোসেন গাজীপুরী অভিযোগ করেন, একদল লোক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায় এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের মারধর করে।
এ ঘটনায় শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমিসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫ জনকে আসামি করে তিনি পৃথক একটি মামলা করেন। ফলে শিশু নিপীড়নের অভিযোগে দায়ের করা মামলা এবং মাদরাসায় হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগে করা মামলা—দুটি ঘিরেই এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন বক্তব্য ও তথ্য ছড়িয়ে পড়ে।
শিশুটির বাবাকে গ্রেপ্তারের খবর সঠিক নয়: পুলিশ কমিশনার
শিশুটির বাবাকে গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান চালানোর বিষয়ে প্রকাশিত খবরের পরিপ্রেক্ষিতে জিএমপি কমিশনার মো. ইসরাইল হাওলাদার বলেন, কোনো মামলা হলেই প্রথমেই আসামিকে গ্রেপ্তার করা আইনের দৃষ্টিতে জরুরি নয়; বরং মামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। এ মামলায় আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা সঠিক নয়।
তিনি আরও জানান, দুটি মামলাই গুরুত্বের সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর তদন্ত ও আইনগত কার্যক্রম যথাযথ নিয়মে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ কমিশনার যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, গুজব ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানো থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।
নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর গুরুত্ব
টঙ্গীর এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে শিশু নিপীড়নের অভিযোগ এবং মাদরাসায় হামলা-ভাঙচুরের পাল্টা অভিযোগ—দুই বিষয়ই আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট সব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ।
তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে যাচাইহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।