মোঃ রফিকুল ইসলামঃ
রাষ্ট্রের অন্যতম সংবিধানে উল্লেখিত নিয়মকে সত্যিই সম্মান করি ?
নাকি সুবিধামতো ব্যবহার করি?
দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শুরু হয়তো এই ছোট প্রশ্নের মাঝেই নিহিত আছে। সংহার শুরু করতে হবে এখান থেকেই।
কারণ, নাগরিক সংস্কৃতি যদি শক্তিশালী হয়, তাহলে আইনও শক্তিশালী হয়। আর যদি নাগরিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়, তাহলে সবচেয়ে কঠোর থেকে কঠোরতর আইনও কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে।
দুর্নীতিকে আমরা প্রায়শই একটি বড় জটিল ও রাজনৈতিক সমস্যা হিসেবে মনে করি।
আমরা কেবলই মনে করি, দুর্নীতি এমন একটা মহামারী যা সরকারি কর্মচারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, রাজনীতিবিদ বা বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের মনে করা হয়।
কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—এবং প্রতিকারের উপায় খোঁজছেন । সর্বোপরি সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে , আমাদের সমাজের বসবাসরত প্রতিটি মানুষ দৈনন্দিন ছোটখাটো নিয়মগুলো সঠিক ভাবে পালনের মধ্য দিয়ে শুরু করতে হবে।
ঘুম থেকে উঠার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত হরহামেশাই যে সব দৃশ্য চোখে পড়ে তা হচ্ছে_ কেউ নির্বিকারভাবে ফুটপাতে থুথু ফেলছেন তিনি হতে পারেন রিকশাচালক, কোট টাই পরা কেতাদুরস্ত চাকুরিজীবী, শিক্ষক, মেম্বার, চেয়ারম্যান, এমপি, মন্ত্রীসহ যে কোনো মানুষ হতে পারেন। বাসের জানালা দিয়ে, সরকারি দপ্তরের সিঁড়িতে, হাসপাতাল, রেলস্টেশন বা বাসস্ট্যান্ডে—এমন কোনো জায়গা যেন নেই যেখানে এমনটা দেখা যায় না। বিশেষ করে ড্রাসবিনের ভেতরটা স্বচ্ছ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন পাওয়া যেতে পারে কিন্তু তার চার পাশে দৃশ্যমান আবর্জনার স্তূপ ঠিক দেখা যায়।
অন্যদিকে, একটি মোটরসাইকেল নির্লিপ্ত ভাবে ফুটপাতের ওপর দিয়ে চালিয়ে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করাটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। উল্টো দিক দিয়ে গাড়ি নিয়ে চলে যাওয়া কিংবা একটি বাস রাস্তার মাঝখানে দাঁড় করিয়ে যাত্রী তোলা, প্লাস্টিকের বোতল বা খাবারের প্যাকেট ফুটপাতে বা পয়ঃনিষ্কাশনের ড্রেনে ফেলে দেওয়া—সব যেন দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
এসব আচরণকে আমরা প্রায়ই ‘ছোটখাটো বিষয়’ বলে উড়িয়ে দিই।
আসলে এইসব হচ্ছে সু-শৃঙ্খল সমাজের অবধারিত নিয়ম সামাজিক নিয়ম । সামাজিক নিয়ম হলো সেই অদৃশ্য চুক্তি, যা আইনের অনুপস্থিতিতেও মানুষকে একে অপরের সঙ্গে সহাবস্থান থাকতে সাহায্য করে। আইন সব সময় উপস্থিত থাকে না, কিন্তু সমাজ আমাদের চলতে হয়। তাই প্রতিটি মানুষ শিশু থেকে বৃদ্ধ সবার উচিত এ সমস্ত মৌলিক নিয়ম মেনে চলা।
তাই রাস্তা, ফুটপাত, গণপরিবহন বা জনপরিসরের অন্যান্য স্থান একটি সমাজের নাগরিক সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষাগার। যখন এখানে ছোট নিয়ম ভাঙা স্বাভাবিক হয়ে যায় এবং কোনো সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না, তখন একটি বিপজ্জনক সংকেত ছড়িয়ে পড়ে সমাজ তথা রাষ্ট্রের সর্বত্র। সিস্টেমের সুত্রপাত যদি নিয়ম মেনে করা যায় এবং সবার নাগরিক দায়িত্ব ও কর্তব্য হিসেবে মানা বাধ্যতামূলক মনে করি, তাহলে দুর্নীতি সুত্রপাত হওয়ার সম্ভাবনা সিংহভাগ কমে যাবে।
মনে রাখতে হবে, ছোট ছোট মৌলিক নিয়ম ভঙ্গ একটা সময় বড় নিয়ম ভঙ্গের বা দুর্নীতির ক্ষেত্র তৈরি করে ।
পরিশেষে বলতে চাই, জনস্বার্থে ব্যবহৃত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনপরিসরকে নিজের সম্পদের মতো ব্যবহার করতে হবে। তাতে নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়। এই আস্থাই প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করে।
অন্যদিকে, যেখানে জনপরিসরকে কেউ নিজের বলে মনে করে না, সেখানে রাষ্ট্রকে অনেক সময় দূরের ও বিচ্ছিন্ন একটি কাঠামো বলে মনে হয়। তখন আইনকে দেখা হয়, একটি বাধা হিসেবে। সহযোগিতার নিয়ম হিসেবে নয়। উন্নত সমাজে নাগরিক শৃঙ্খলা কেবল আইন দিয়ে নয়, মৌলিক, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও লজ্জা পারস্পরিক নজরদারির মাধ্যমেও বজায় থাকে।
https://shorturl.fm/VKHAP
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই নাগরিক সংস্কৃতি যদি দুর্বল। এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।