দেশের খেটে খাওয়া মানুষ কখনো সংঘাত চায় না। তাঁরা চায় নায্য অধিকার ও ন্যায়বিচার।
মোঃ রফিকুল ইসলামঃ
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ সংকট, পাহাড়ে অশান্তি, গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা, সব মিলিয়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নানা সংকটের মধ্যে। তাই, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি প্রশ্ন… দেশের অর্থনীতিতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার ?
একদিকে সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোয় ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পের একজন শ্রমিকের সর্বনিম্ন মাসিক বেতন মাত্র ১২, হাজার ৫’শ টাকা। এটা কি বৈষম্যের মধ্যে পড়ে না ?
১২ হাজার ৫’শ টাকায় একজন শ্রমিক কীভাবে নিজের খাবার, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, সন্তানের লেখা পড়া সহ পরিবারের অন্যান্য খরচ চালাবে ?
যে শ্রমিকের শ্রমের বিনিময়ে দেশের পোশাক রপ্তানি হয়, যে শিল্প দেশের লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, সেই শ্রমিকের জীবন মান নিয়ে রাষ্ট্র কতটা ভাবছে ?
গার্মেন্টস খাতে আন্দোলন চলছে। সংবাদে প্রায় ৩০০টি কারখানা ছুটি ঘোষণার খবরও দেখা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। শ্রমিকদের অভিযোগ, মালিকপক্ষের অবস্থান, কারখানার বাস্তব পরিস্থিতি এবং ন্যায্য মজুরির দাবি সবকিছু নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করতে হবে।
শ্রমিকের ন্যায্য দাবি শোনা হোক, সেই সাথে শিল্পের কর্মপরিবেশ ও কর্মসংস্থানও রক্ষা করা হোক।
সরকারের পক্ষ থেকে গৃহীত সিদ্ধান্ত যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রত্যেক নাগরিকের ন্যায্য অধিকার এবং তাদের পরিবার যেন সহজে ও সময়মতো রাষ্ট্রের সহায়তা পায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
সাধারণ মানুষের দাবী সকল বিষয় চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো বন্ধ হোক।
অন্যদিকে, কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের জীবন মান উন্নত হোক। যেখানে সরকারি কর্মচারী বেতন ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে সেখানে একই দেশের শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী ও বেসরকারি খাতের কর্মজীবী মানুষের জীবন মান উন্নয়নের বিষয়টি উপেক্ষিত থাকবে কেন? একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু একটি শ্রেণির দিয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
রাষ্ট্রের সার্বিক পরিস্থিতি হিসেবে স্পষ্ট দাবিঃ
(১) গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্মানজনক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করতে হবে।
(২) নতুন মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের প্রকৃত ও স্বাধীন প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
(৩) শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, বোনাস ও অন্যান্য পাওনা সময় মতো পরিশোধ করতে হবে।
(৪) শ্রমিকদের ওপর অন্যায়, নির্যাতন, ছাঁটাই ও হয়রানির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কারখানা ভাঙচুর ও সহিংসতার অভিযোগও আইন অনুযায়ী বিচার করতে হবে।
(৫) সর্বোপরি সরকারি কর্মচারীদের পাশাপাশি গার্মেন্টস শ্রমিক, কৃষক, দিনমজুর ও প্রবাসীদের জীবন মান উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় বাজেটে কার্যকর পরিকল্পনা নিতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাইঃ..
কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর হোক বা পাহাড়ের মানুষ। গার্মেন্টস শ্রমিক হোক অথবা বিদেশে কর্মরত প্রবাসী কিংবা সরকারি কর্মচারী সবাই এই দেশের নাগরিক। কারও অধিকার কেড়ে নিয়ে অন্য কারও উন্নয়ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নীতি হতে পারে।
মনে রাখতে হবে, গার্মেন্টস শ্রমিকের ঘাম, কৃষকের ফসল এবং প্রবাসীর পাঠানো অর্থ সবকিছু মিলিয়েই বাংলাদেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। যে শ্রমিক দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন, তাঁর নিজের পরিবার যদি দুবেলা খাবার, চিকিৎসা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা না পায়, তাহলে সেই উন্নয়নের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
সরকারের কাছে প্রশ্ন ..
দেশের অর্থনীতির জন্য যারা রাতদিন শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কে নেবে ?
দেশের খেটে খাওয়া মানুষ কখনো সংঘাত চায় না। তাঁরা চায় নায্য অধিকার ও ন্যায়বিচার।
বাংলাদেশের মানুষ গার্মেন্ট শিল্পে ধ্বংস চায় না, তাঁরা শ্রমিকের অধিকার ন্যায্য অধিকার চায়। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের পর এই দেশে আবারও বৈষম্য হলে তার পরিনতি জুলাই ২৪ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। দেশের মানুষ সবার জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন আশা করে।
দেশটা শুধু ক্ষমতাবানদের নয়, দেশটা শ্রমিকের, কৃষকের, প্রবাসীর, সরকারি কর্মচারীর সহ সবার।