স্টার্ফ রিপোর্টার: গাজীপুর মহানগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত ময়লা-আবর্জনা সরাসরি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে ফেলা হচ্ছে। ফলে প্রতিদিনই দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ছে নগরবাসীসহ পথচারী, স্থানীয় দোকানি ও যাত্রীরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে পরিকল্পনার অভাব এবং দায়িত্বে অবহেলার কারণেই এমন অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
মহাসড়কের পাশের টঙ্গী স্টেশন রোড, চান্দনা চৌরাস্তা, ভোগড়া বাইপাস ও বোর্ডবাজার এলাকার গাছা রোডে দেখা গেছে, করপোরেশনের ট্রাকগুলো প্রতিদিনই রাস্তার পাশে ময়লা ফেলে চলে যাচ্ছে। গরমের দিনে দুর্গন্ধ এতটাই তীব্র হয় যে, আশপাশের দোকানগুলোতে বসে থাকা যায় না।
ঢাকা থেকে আসার পথে উত্তরার আবদুল্লাহপুর পেরোলেই টঙ্গী শহর। এখান থেকেই শুরু গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক সীমানা। রাস্তার ধারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের দুই পাশজুড়ে জায়গায় জায়গায় জমে থাকা আবর্জনার স্তুপ একটানা চলে গেছে চান্দনা চৌরঙ্গী ভাস্কর্য পর্যন্ত। চৌরাস্তা থেকে শহরমুখী পথে পা রাখলেই চোখে পড়ে এমন দৃশ্য।
শিববাড়ি, লক্ষীপুরা, দক্ষিণ ও উত্তর ছায়াবীথি, জোড়পুকুর, হাড়িনাল কিংবা রেল জংশনসহ প্রতিটি এলাকাই যেন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
শিল্প অধ্যুষিত দেশের সবচেয়ে বড় সিটি করপোরেশন গাজীপুর। কিন্তু এই সিটির রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। বায়ুদূষণের শীর্ষ শহর হিসেবেও রয়েছে গাজীপুরের নাম। যেখানে ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধে এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব ময়লা আবর্জনা ফেলা হচ্ছে মহাসড়কের ওপরে।
যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনার স্তুপের কারণে নাকে রুমাল চেপে চলাচল করতে হচ্ছে নগরবাসীকে। শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষকে স্কুল, কলেজ ও মসজিদে আসা যাওয়া ও যানবাহন চলাচলে বাড়তি ভোগাস্তিতে পড়তে হচ্ছে। গাজীপুরে শোধনাগার না থাকায় কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ফেলা হচ্ছে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
এলাবাসী জানায়, জেলায় বর্জ্য শোধনাগার না থাকায় কয়েক বছর ধরেই ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তৈরি করা হয়েছে বর্জ্যের ভাগাড়। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা, হাসপাতাল ও বাসাবাড়ির বর্জ্য ফেলা হচ্ছে মহাসড়কের পাশে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার তেলিপাড়া, সালনা, গাজীপুর সদর উপজেলার রাজেন্দ্রপুর, ভবানীপুর, হোতাপাড়া, শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী, এমসি বাজার, জৈনা বাজার এলাকায় বর্জ্যের বিশাল স্তুপ দিয়ে রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি করপোরেশন এলাকার ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কড্ডা বাইমাইল এলাকায়ও ময়লার ভাগাড় চোখে পড়েছে। জয়দেবপুর বাইপাস-মীরের বাজার সড়কের ঝাঝর, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের মরকুন এলাকায়ও মহাসড়কের পাশে নিয়মিত ফেলা হচ্ছে বর্জ্য। কালিয়াকৈর নবীনগর সড়কের চক্রবর্তী এলাকায় তৈরি হয়েছে ময়লার পাহাড়।
এসব বর্জ্যের কারণে আশপাশের এলাকার বাতাস দূষিত হচ্ছে। মহাসড়কের পাশে রাখা বর্জ্যের গন্ধে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের চক্রবর্তী এলাকার সাধারণ মানুষের বক্তব্য হচ্ছে, একসময় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে বেড়াতাম। এখন আর সেই পরিবেশ নেই। মহাসড়কের পাশে রাখা বর্জ্যের দুর্গন্ধে হাঁটা তো দূরের কথা বমি চলে আসে।
কোনাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জনৈক আব্দুল আলী বলেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের চলাচল সেই মহাসড়কের পাশে কড্ডা এলাকায় ময়লা ফেলে রিতিমতো পাহাড় তৈরি করা হয়েছে। গভীর রাতে বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্য এনে এখানে রাখা হয়। এসব বর্জ্যের কারণে পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। ইতোমধ্যে শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ দীর্ঘদিনেও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ একটি কার্যকর ও স্থায়ী বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশন বা আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু করতে পারেনি। ফলে মহাসড়ক ও জনবহুল এলাকার পাশে আবর্জনার পাহাড় তৈরি হচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের অবনতির অন্যতম কারণ। শ্বাসকষ্ট, পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সিটি কর্পোরেশনের এই উদাসীনতা নাগরিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন।
দেখা যায়, যেখানে ময়লা ফেলা হচ্ছে সেখানেই নালার পানি জমে গিয়ে তৈরি হচ্ছে কালচে পঙ্কিল স্তর, যা থেকে মশা ও মাছি উৎপন্ন হচ্ছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর ওই এলাকায় দাঁড়ানোই কষ্টকর হয়ে পড়ে।
পরিবেশ সচেতন নাগরিকদের মতে, “এটি শুধু সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্গন্ধে শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বাড়ছে।”
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “স্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন তৈরির কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। তাই অস্থায়ীভাবে কিছু এলাকাকে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে খুব শিগগিরই নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য স্থানান্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে নাগরিকদের দাবি সিটি করপোরেশনের জন্মলগ্ন থেকে “অস্থায়ী” শব্দটি শুনতে শুনতে বছরের বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তবে কোন পরিবর্তন হচ্ছে না। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তরের দৃটি আকর্ষণ করছেন নগরবাসী।
https://shorturl.fm/9Wn7X